সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি: নিহত ২, নিখোঁজ অন্তত ২

সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি: নিহত ২, নিখোঁজ অন্তত ২


ঢাকার ব্যস্ততম নৌযান কেন্দ্র সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুইজনের প্রাণহানি এবং অন্তত আরও দুইজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৮ মার্চ ২০২৪) বিকেলে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের অতিরিক্ত চাপের মধ্যেই এই দুর্ঘটনা ঘটে, যা মুহূর্তেই স্বাভাবিক পরিবেশকে আতঙ্কে পরিণত করে।


প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় 

বিকেলের দিকে সদরঘাটের ১১ নম্বর পন্টুন এলাকায় যাত্রী ওঠানামার সময় দুটি লঞ্চের মধ্যে ধাক্কা লাগে। এমভি জাকির সম্রাট-৩ নামের একটি লঞ্চ  অন্য আসাযাওয়া লঞ্চ-৫ কে জোরে ধাক্কা দিলে তাদের মাঝখানে থাকা একটি ছোট ট্রলার চাপা পড়ে যায়। এতে ট্রলারটি মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায় এবং এতে থাকা যাত্রীদের অনেকেই পানিতে ছিটকে পড়েন।



ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন জানান 

দুর্ঘটনার সময় ঘাটে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। ঈদের আগে বাড়ি ফেরার জন্য শত শত মানুষ লঞ্চে উঠছিলেন। ঠিক সেই সময় হঠাৎ বিকট শব্দে দুটি লঞ্চের সংঘর্ষ ঘটে এবং ট্রলারটি ডুবে যেতে দেখা যায়। কেউ কেউ চিৎকার করে সাহায্য চাইতে থাকেন, আবার কেউ পানিতে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন।



উদ্ধার কার্যক্রম 

দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা চালান। স্থানীয় লোকজনও উদ্ধার কাজে অংশ নেন। তবে পানির স্রোত এবং ভিড়ের কারণে উদ্ধার কাজ কিছুটা ব্যাহত হয় বলে জানা গেছে।


 হতাহতের খবর 

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজনের নাম মো. সোহেল ফকির (২২)। তিনি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। পরিবারের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাতে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সদরঘাটে এসেছিলেন বলে জানা গেছে। অন্য নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে সোহেল ফকিরের স্ত্রী রুপা আক্তার (২০) গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এছাড়াও অন্তত দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন সোহেলের শ্বশুর মিরাজ হোসেন। উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পানির নিচে ডুবে যাওয়া ট্রলারটি শনাক্ত করার জন্য ডুবুরি দল কাজ করছে।


দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ধারণা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ 

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, নৌযানের অসতর্ক চলাচল এবং ঘাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, লঞ্চগুলো নির্ধারিত নিয়ম না মেনে দ্রুতগতিতে চলাচল করছিল এবং পর্যাপ্ত তদারকি ছিল না।

ঘটনার পর নৌ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত লঞ্চগুলোর রুট পারমিট সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।


উপসংহার

নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে এই দুর্ঘটনার পর। বিশেষ করে ঈদের মতো বড় উৎসবের সময় যখন যাত্রীচাপ বেড়ে যায়, তখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা, কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত পরিদর্শন ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা জোরদার করা হবে।

 এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতা কিভাবে বহু মানুষের জীবনে শোক বয়ে আনতে পারে, সদরঘাটের এই ঘটনা তারই করুণ উদাহরণ হয়ে রইল।


No comments:

Post a Comment

২০২৬ সালে হরমুজ প্রণালী বন্ধ: বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়

   ২০২৬ সালে হরমুজ প্রণালী বন্ধ: বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য মহাবিপর্যয় ভূমিকা বিশ্ব অর্থনীতি আজ এমনভাবে আন্তঃনির্ভরশীল যে একটি গুরুত্বপূর্...